ব্যাংক পিএলসির জন্য কেন বাংলাদেশ বাঙ্কের অনুমদন নিতে হয়ই
ব্যাংক পিএসসির জন্য কেন বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন নিতে হয় ?এটি জানার আগে প্রথমে
জানতে হবে, ব্যাংক পিএলসি কি ? পিএলসি কে ইংলিশে (Public Limited
Company) বলে। অর্থাৎ যে ব্যাংক কোম্পানির শেয়ার জনসাধারণের
কাছে বিক্রি করা হয় এবং যার মালিকানা অনেক মানুষের মধ্যে ভাগ করা থাকে ,তাকে
ব্যাংক পিএসসি বলে।
ব্যাংক পিএসসির কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে ,তার মধ্যে চারটি বৈশিষ্ট্য খুবই
গুরুত্বপূর্ণ । এই চারটি বৈশিষ্ট্য যদি কোন ব্যাংকের মধ্যে থাকে তাহলে বাংলাদেশ
ব্যাংক সেই ব্যাংকে পিএলসি দিতে সমর্থন হয়।
পোস্ট সূচীপত্রঃ ব্যাংক পিএলসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন
- আমানত কারীদের স্বার্থ রক্ষা
- ব্যাংক কোম্পানির আইন ১৯৯১ মানা
- দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ
- মানি লন্ডারিং ও জালিয়াতি ঠেকানো
- ব্যবস্থাপনা ও মালিকানার স্বচ্ছতা
- আর্থিক স্থিতিশীলতা
- নাম পরিবর্তন ও আইনি রূপ
- পরিচালক ও উদ্যোক্তাদের যোগ্যতা যাচাই
- শাখা ও এটিএম এর জায়গা অনুমোদন
- নগদ জমা ও তারল্য নিয়ন্ত্রণ
- ঋণ নীতি ও সুদের হার তদারকি
- তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা
- বার্ষিক অডিট ও রিপোর্টিং
- উপসংহার
আমানত কারীদের স্বার্থ রক্ষা
বাংলাদেশ ব্যাংক অন্যান্য ব্যাংকে পিএলসি দেয়ার সময় কিছু জিনিস
পর্যবেক্ষণ করে যেমন গ্রাহক তার টাকা আমানত হিসাবে ব্যাংকের রাখলে সে
ব্যাংকের মূলধন ও পরিচালক প্ল্যান সব ঠিক আছে কিনা যাতে ব্যাংক পরে দেউলিয়া হয়ে
তাদের টাকা মেরে না পালিয়ে যেতে পারে। ব্যাংক মূলত জনগণের আমানতের টাকা দিয়েই
চলে তাই আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করায় ব্যাংকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব
বাংলাদেশ ব্যাংক এই জন্য অনেক পড়া নিয়ম করে দিয়েছে ব্যাংকে বাধ্যতামূলকভাবে
সিআরআর এবং সি এল আর মেনে নগদ টাকা রিজার্ভ রাখতে হয় যাতে গ্রাহক চাইলে কোন সময়
টাকা তুলতে পারে।
ব্যাংক কোম্পানির আইন ১৯৯১ মানা
এই আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ নতুন ব্যাংক খুলতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে লাইসেন্স
বাধ্যতামূলক RJSC এর রেজিস্ট্রেশন হলে হবে না। এটি যথাযথ আইনগত
নিজেদের স্বার্থের জন্য ব্যবহার না করতে পারেঅনুযায়ী বৈধ কিনা এবং এটি প্রতিবছর
রিনিউ করা হয়েছে কিনা সেদিকেও বাংলাদেশ ব্যাংক খেয়াল রাখে যাতে জনসাধারণের
আমানতের টাকা কোন ব্যাংক।
দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশ ব্যাংক হল কেন্দ্রীয় ব্যাংক । সে ঠিক করে দেশের কয়টা ব্যাংক দরকার,
কোথায় শাখা হবে। ঋণের নিয়ম কি হবে। এলপাথারি ব্যাংক খুললে মুদ্রাস্ফীতি ঋণ
খেলাপি বেড়ে যায়, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতির কে নিয়ন্ত্রণ করার
জন্য ব্যাংক পিএলসি জন্য অনুমোদন দিয়ে থাকে । দেশের অর্থনীতি
নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। মুদ্রাস্ফিতি কমানোর ,টাকার
মান ঠিক রাখা এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার সিআরআরসি ,
এলআর এর রেকর্ড রিভার্স রিপোর্ট নিয়ন্ত্রণ করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এই নীতি
অনুযায়ী ঋণ বিতরণ ও আমানত সংগ্রহ করে । ফলে বাজারে টাকা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে থাকে
। বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেখভাল করে এবং সরকারের সাথে মিলে
উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অধ্যায়নের ব্যবস্থা করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক
প্রবৃত্তি স্থিতিশীল রাখা, বেকারত্ব কমানো এবং দেশের অর্থনৈতিক খাতকে শক্তিশালী
করা ।
মানি লন্ডারিং ও জালিয়াতি ঠেকানো
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালকদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে যাতে কোন খারাপ লোক ব্যাংকের
নামে টাকা পাচার বা জালিয়াতি করতে না পারে ।এই ক্ষেত্রে যাতে আমানতকারীদের আস্থা
ব্যাংকের উপরে বজায় থাকে । যার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক কাউকে অন্য কোন
ব্যাংকে অনুমোদন দেওয়ার সময় তার বিভিন্ন রকমের কাগজ পত্র চেক করে থাকে ।
মানি লন্ডারিং ও জালিয়াতের ঠেকানোর জন্য ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম
মেনে কঠোর KYC এবং Transaction Monitoring করতে হয় । গ্রাহকের পরিচয়,
আয়ের উৎস্ও লেনদেনের উৎস যাচাই করা বাধ্যতামূলক সন্দেহজনক লেনদেন পাওয়া
গেলে । তার সাথে সাথে বিএফআইইউ তে রিপোর্ট করতে হয় ।এছাড়া ব্যাংকে শক্তিশালী
আউট সিস্টেম রাখা হয় যাতে জালিয়াতি না হয় । এর মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকের
সুনাম রক্ষা করা এবং দেশের অর্থনীতিকে নিরাপদ রাখা।
আরো পড়ুনঃ প্রতিসপ্তাহে ৪০০ টাকা ইনকাম করুন
ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা স্বচ্ছতা
ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক হিসেবে কারা আছেন। এবং ব্যবস্থাপনার ঠিকমতো চালাচ্ছে
কিনা? তা যাচাই করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ ।ব্যাংকে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত
টাকা জমা থাকে তাই এই টাকা সঠিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছ মালিকানা দ্বারা পরিচালিত
হলে ব্যাংকের ওপর সকলের আস্থা বাড়বে এইটার জন্য বাংলাদেশ কাজ চালিয়ে
যাচ্ছে ।
আর্থিক স্থিতিশীলতা
দেশের মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন এবং সামগ্রিক আর্থিক
হাতের ভারসাম্য রক্ষা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয় এবং এভাবেই
অন্যান্য ব্যাংক গুলা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আস্থা অর্জন করে চলেছে এবং এর
মাধ্যমে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ব্যাংক পিএসির জন্য অনুমোদন নিয়ে
থাকে।
নাম পরিবর্তন ও আইনি রূপ
সম্প্রীতি কোম্পানি আইন অনুযায়ী সব পাবলিক লিঃ ব্যাংকের নামের শেষে পিএলসি যুক্ত
করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই নাম পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি
নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয় হয়। আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো জটিলতা
থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ব্যাংকের পিএলসি প্রদান করতে অব্যাহত
থাকে।
পরিচালক ও উদ্যোক্তাদের যোগ্যতা যাচাই
যারা ব্যাংক চালাবে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আর্থিক সততা, ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই পরে কোন ঋণ খেলাপি বা দাগি লোক পরিচালক হতে পারবে না
। যদি এমন কোন অসৎ ব্যাক্তি ব্যাংক পরিচালনা করে থাকে এবং এটি বাংলাদেশ
ব্যাংকের কাছে ধরা পড়ে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।
আরো পড়ুন ঃটেবিল বানানোর ক্লাস
শাখা ও এটিএম এর জায়গা অনুমোদন
কোথাও ব্যাংকের শাখা খোলা হবে সেটাও বাংলাদেশ ব্যাংক ঠিক করে দেয়। এক এলাকায়
বেশি ব্যাংক হলে প্রতিযোগিতা বেড়ে যায় ,আবার কিছু এলাকা ব্যাংক সেবার বাইরে
থেকে যায় । তাই বাংলাদেশ ব্যাংক এমন জায়গায় অনুমোদন নিতে বলে যে জায়গায়
গ্রাহক তার সেবা নির্দিধায় নিতে পারবে এবং যেখানে ব্যাংক সেবা নির্বিঘ্নে
দেয়া সম্ভব। ব্যাংক ইচ্ছা করলে যে কোন জায়গায় শাখা বা এটিএম বসাতে
পারেনা । এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগে । বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন
দেওয়ার আগে ওই এলাকার ব্যাংকিং সেবার চাহিদা , জনসংখ্যা ব্যবসা-বাণিজ্য এবং
নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই করে ।গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে
দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট সংখ্যক শাখা গ্রামীণ এলাকায় খুলতে
বাধ্য করে । আবার এটিএম বসানোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিদ্যুৎ ও জায়গার উপযুক্ত
দেয়া হয়। শাখা ও এটিএম এর জায়গা অনুমোদনের উদ্দেশ্য হল সারাদেশে সুষম ব্যাংকিং
সেবা নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা বন্ধ করে গ্রাহকদের
সুবিধা বাড়ানো।
নগদ জমা ও তারল্য নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশ ব্যাংক ঠিক করে দেয় ব্যাংকে তার মোট আমানতের কত শতাংশ নগদ আকারে CRR
এবং কত শতাংশ সরকারি বন্ডে SLR হিসেবে রাখতে হবে। এতে গ্রাহক চাইলে টাকা তুলতে
পারবে , এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী তারা এখান থেকে লোন নিতে পারবে। ব্যাংক
জনগণের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঋণ দেয় কিন্তু সব টাকা যদি দিন দিয়ে দেয় তাহলে
গ্রাহক চাইলে টাকা তুলতে পারবে না এইজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ জমা ও তারল্য
নিয়ন্ত্রণ করে।
ঋণ নীতি সুদের হার তদারকি
ব্যাংক যাতে ইচ্ছামত বেশি সুদের ঋণ দিয়ে মানুষকে ফাঁসাতে না পারে, বা কম
সুদে আমানত নিয়ে ক্ষতি না করে সেটা বাংলাদেশ ব্যাংক মনিটর করে। বাংলাদেশ
ব্যাংক ঋণ নীতি সুদের হার তদরকি করার জন্য তাদের নিজস্ব কর্মীকে নিয়োগ দিয়ে
থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সুদের হার বেধে দেয়
,যাতে ব্যাংক ইচ্ছামত বেশি সুদে ঋণ দিয়ে গ্রাহককে চাপে না ফেলে আবার আমানতের
সুদের হার মনিটর করে যাতে গ্রাহক নায্য মুনাফা পায়।
আরো পড়ুনঃবাংলায় আর্টিকেল লেখার নিয়ম
তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা
বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুরোপুরি তথ্য ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল । অনলাইন
ব্যাংকিং , মোবাইল ব্যাংকিং্এ সবকিছু কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে চলে । এ
কারণে সাইবার নিরাপত্তা ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ।
গ্রাহকদের একাউন্ট তথ্য, লেনদেনের ডাটা , টাকা সব ডিজিটাল সেফ থাকে ব্যাংকের
সফটওয়্যার ডাটা সেন্টার , অনলাইন ব্যাংকিং সিস্টেম নিরাপত্তা আছে কিনা ।
বাংলাদেশ ব্যাংক টেস্ট করে গ্রাহকের তথ্য যাতে ফাঁস না হয় । এবং গ্রাহক
যাতে নির্বিঘ্নে তাদের সেবা নিতে পারে, সেদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক লক্ষ্য রাখে এবং
এটির জন্য তাদের প্রতিনিয়ত ট্রেনিং প্রাপ্ত একজন কর্মী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া
হয়ে থাকে।
বার্ষিক অডিট ও রিপোর্টিং
ব্যাংকে প্রতি মাসে ,প্রতি মাসিক ৬ মাসিক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে
হিসাব জমা দিতে হয়। কোন অনিয়ম হলে সাথে সাথে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ব্যবস্থা
গ্রহণ করবে এবং তাতে বৈধ লাইসেন্স বাতিল করে দিবে । বার্ষিক রিপোর্টের ক্ষেত্রে
লাভজনক দিক বিবেচনা করে ব্যাংকের মেয়াদ আরো বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বছর
শেষে ব্যাংক তার বার্ষিক প্রতিবেদন রিপোর্ট তৈরি করে এখানে ব্যালেন্স শিট
লাভলকশান হিসাব পরিচালকদের রিপোর্ট থাকে এটা শেয়ার হোল্ডার ও সাধারণ মানুষ দেখতে
পারে।
উপসংহার
যেহেতু ব্যাংকিং ব্যবস্থা একটি ইস্মার্ট ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান । আর ব্যাংক
পিএলসির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয় কারণ, ব্যাংক সাধারণত কোম্পানির
মতো না এখানে সাধারণ মানুষের তাদের কষ্টের টাকা জমা রাখে।, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক
প্রথমে যাচাই কর, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা মূলধন আর পরিচালনা সৎ ,যোগ্য কিনা ।
ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া কোন ব্যাংক ব্যবসা করতে
পারবেনা ।এছাড়া দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক
ঠিক করে দেয় দেশের কয়টা ব্যাংক দরকার ,কোথায় শাখা হব, এবং সুদের হার কেমন হবে
। তাই জনগণের আমানতে নিরাপত্তা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশ
ব্যাংকের কঠোর অনুমোদন লাগে আর এভাবে একজন গ্রাহক তার পরিশ্রমের টাকা শান্তিতে
ব্যাংকে রাখতে পারে।
সাগিরা আইটি নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url